A

A writing of Gouranga Chatterjee

এক যন্ত্রনা, এক বঞ্চনার লোক কথা :
লেখক: কমঃ গৌরাঙ্গ চ্যাটার্জি।
●●●●●●●
বছর কয়েক আগে এক বার আমরা দশমীর দিন গিয়েছিলাম ঝাড়খন্ডের হুড্রু ফলসের কাছে বেড়াতে।সেদিন প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছিল হুড্রু ফলসের চেহারাও দারুন হয়েছিল-গোটা সুবর্ণরেখা একেবারে ঝাঁপিয়ে নেমেছে এখানে ।
বিকেলের দিকে যখন আমরা রওনা দিলাম সুবর্ণরেখা পরিয়ে প্রথমেই পুরুলিয়া জেলা তার পর বাঁকুড়ার দিকে যত এগোচ্ছি দেখছি এখানের আদিবাসী ভাইবোনের নানা সাজে নাচ গান বাজনা বাজিয়ে বাজিয়ে দল বেঁধে এগিয়ে যাচ্ছেন।
অনেক পুরুষকেও দেখলাম তাঁরা আবার আবার মহিলাদের মত শাড়ি পড়ে মহিলা সেজে আছেন। আমরা ভাবলাম এরাও হয়ত এভাবে দূর্গোৎসব পালন করছেন।
আমরা তো ছোট থেকেই জানি দূর্গোৎসব বাংলা তথা বাঙ্গালীর শ্রেষ্ঠ উৎসব। পরে বুঝলাম আমার জানাটাই সব নয়,দেখলাম একটা অন্য ধারার সংস্কৃতিও এই দূর্গোৎসবে বাংলার আদিবাসী সমাজে সর্বত্র চালু আছে।
খোঁজ নিয়ে জানলাম আদিবাসী সমাজ "হুদুরদূর্গার" উদ্যেশ্যে এটা করে থাকেন । এই 'হুদুরদূর্গা' কি এটা জানার জন্য নানা জনের সাথে কথা বলে যা বুঝলাম তাতে এক সাংঘাতিক তথ্য উঠে এল।
'দুর্গা 'সাঁওতাল ভাষায় পুংলিঙ্গ। 'হুদুরদূর্গা' হলেন আদিবাসী সমাজের এক শক্তিশালী নৃপতি তাঁকে আর্যরাও পরাস্ত করতে পারতেন না। আর্যদের রাজা স্বয়ং ইন্দ্র। তিনি নানা ভাবে 'হুদুরদূর্গাকে' বাগে আনতে না পেরে অন্যায় ভাবে হত্যা করেন। সাঁওতালরা এই 'হুদুরদূর্গার' প্রতি আর্যদের অন্যায় আচরণকে 'দাঁসায় গান' ও 'ভুয়াং নাচে'র মধ্য দিয়েই এই শারদোৎসবের কয়দিন প্রকাশ করেন।
কিন্তু কেন এটা এঁরা করেন এর পিছনে লোকশ্রুতি কি আছে ? সাঁওতালী লোকসাহিত্যে উল্লেখ রয়েছে যে তাঁদের রাজা 'হুদুরদুর্গার' কণ্ঠস্বর ছিল বজ্রের(হুদুড়) মত। তিনি ছিলেন মহা পরাক্রমী বীর। আর্য রাজ ইন্দ্র বহুবার 'হুদূর দুর্গার' হাতে পরাজিত হয়।।সাত সাত বার 'হুদুরদূর্গাকে' আক্রমণ করে পরাজিত হওয়ার পরে আর্য নৃপতি 'ইন্দ্র' বুঝতে পারেন সন্মুখ সমরে 'হুদুড়দুর্গাকে' পরাজিত করা অসম্ভব। অতয়েব নিতে হবে ছলনার আশ্রয়।এবার সেটাই নেন আর্য নৃপতি ইন্দ্র। খোঁজ করেন 'হুদুড়দূর্গার' কোন কোন দুর্বলতা আছে তা জানার ।
অসুররা কখনোই আশ্রিতের সাথে, শিশুর সাথে, নারীর সঙ্গে এবং রাত্রিতে যুদ্ধ করতেন না। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন আর্য নৃপতি 'ইন্দ্র'। লাবন্যময়ী এক গৌরবর্ণা রমণীকে পাঠান 'হুদূরদুর্গার' কাছে। কথিত আছে তিনি সর্ম্পকে ছিলেন 'ইন্দ্রের' ভগনী।
অসুরনীতি অনুসারে এক স্ত্রী থাকতে দ্বিতীয় বার বিবাহ করা যায় না। অনার্য সভ্যতায় স্ত্রী ভিন্ন পরনারী গমন অনায্য। তাই এই ছলনাময়ীকে প্রত্যাখ্যান করেন 'হুদূরদুর্গা'। এবার ইন্দ্র বিফল হয়ে সন্ধির প্রস্তাব দেন।'হুদুরদূর্গার' বিশ্বাস অর্জনের জন্য এবং নিজ বোনের সাথে আবার 'হুদুড়দুর্গার' বিবাহের প্রস্তাব দেন আর্য নেতা 'ইন্দ্র'।
স্বভাবতই এক স্ত্রী থাকতে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন হুদুরদূর্গা।ইন্দ্র তখন 'হুদুরদূর্গার' পৌরুষ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাকে বিচলিত করে তোলেন।
এক প্রকার নিজের পৌরুষ রক্ষার্থে 'হুদুরদূর্গা' তখন ইন্দ্রের বোনকে বিবাহে রাজী হন। অমাবস্যার পর প্রতিপদের দিনে এঁদের বিয়ে হয়।
বোনের মাধ্যমে ইন্দ্র জানতে পারেন শোবার আগে রাত্রি বেলায় 'হুদুড়দুর্গা' তাঁর অস্ত্র নিজের কাছ থেকে সরিয়ে রাখেন।তখন তার কাছে রক্ষীরাও থাকে না। 'ইন্দ্র' ঠিক করেন এরকম এক রাত্রে কামাশক্ত এবং মাদকাসক্ত করে 'হুদুরদূর্গা'কে হত্যাকরে তার লাশ পাচার করতে হবে।এবং সেটা তার বোনকে দিয়েই করাতে হবে। এর পর বিয়ের অষ্টম দিনে 'ইন্দ্র' 'হুদূড়দুর্গা'কে হত্যা করার নির্দেশ দেন তার বোনকে।এবং নবমীর রাতেই 'হুদূড়দুর্গা'কে হত্যা করতে হবে বলে আদেশ দেন।
'ইন্দ্রের' বোন দাদার পরামর্শ মত কাছে লুকোনে ছুরি দিয়ে 'হুদুরদূর্গা'কে খুন করে আগে থেকে প্রস্তুত 'ইন্দ্রে'র মাধ্যমে কোন অজানা স্থানে 'হুদুরদূর্গা'র লাশ পাচার করে ফেলে। এখনও এই আদিবাসীরা বিশ্বাস করে কোন এক গৌরবর্ণা নারী তাঁদের রাজাকে বন্দী করে নিয়ে গেছে এবং গোপন ডেরায় তাকে ছলনার আশ্রয় নিয়ে হত্যা করেছে।
আজও বুক চাপড়ে ও হায়রে,হায়রে আওয়াজ করে 'ভুয়াং নাচের' মাধ্যমে আদিবাসীরা তাঁদের রাজাকে খুঁজে বেড়ান। বুক চাপড়ে ও হায়রে, ও হায়রে ধ্বনি তুলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নাচ করেন। এই নাচকে বলা হয় ভুয়াং নাচ। রাজার ব্যথায় ব্যথিত হয়ে এঁরা নাভি ও বুকে বনৌষধি তেল লাগান।
হুদুড়দুর্গাকে হত্যা করার কারনে এই গৌরবর্ণা আর্যা রমণী এর পর থেকে “দেবীদুর্গা” নামে পরিচিতি লাভ করেন । এবং আদিবাসীরা পরাজিত হন এবং নিজ রাজ্য থেকে বিস্তারিত হন।
লাউয়ের শুকনো খোলের উপর ধনুকের মত 'ভুয়াং' বাদ্যযন্ত্রতে টঙ্কার তুলে এই আর্তনাদ আসলে তাঁদের হারিয়ে যাওয়া রাজার উদ্দেশ্যে নিবেদিত।'হায়রে'-'হায়রে' ধ্বনি তুলে তাঁরা টিকটিকি,মাকড়সা গাছপালা, পশুপাখিদের প্রশ্ন করেন তাঁদের রাজাকে তারা দেখেছে কি?তাঁরা বিশ্বাস করেন যে এই প্রশ্নের উত্তর কেবল 'হুদুড়দুর্গা' বা 'মহিষাসুর'ই দিতে পারেন।"দাঁসায়” আদিবাসীদের একটি শোকপালনের ব্রত।গান গেয়ে গেয়ে পাঁচদিন ধরে চলে এই শোক পালন।
গানের সুরে তাঁরা প্রশ্ন করেন,
"তকারে দ ভুয়াং এম জানামলেনা রে?
তকারে দ ভুয়াং এম বুঁসাড়লেনা রে?
খত মাদের রে ভুয়াং এম জানামলেনা রে
গড়া সাড়িমরে ভুয়াং এম বুঁসাড়লেনা রে
চেতে লাগিৎ ভুয়াং এম জানামলেনা রে
চেতে লাগিৎ ভুয়াং এম বুসাঁড়লেনা রে
দেশ দাড়ান লাগিৎ ভুয়াং এম জানাম লেনা রে
দিসম সাঙ্গার লাগিৎ ভুয়াং এম বুঁসাড়লেনা রে।"
এই শোক পালন হয় নাচ, গান এবং ভিক্ষার মাধ্যমে।ভিক্ষাবৃত্তি সাঁওতাল সমাজে এক সামাজিক অপরাধ হলেও দাঁসায়ের দিনগুলিতে তাঁরা ভিক্ষা করেন। এই কারনে সাঁওতাল সমাজে আমরা কোন ভিক্ষুক দেখতে পাই না। তাঁরা বিশ্বাস করেন কোন এক গৌরবর্ণা আর্যা রমণী তাঁদের রাজাকে বন্দী করে নিয়ে গোপন ডেরায় তাকে ছলনার আশ্রয় নিয়ে হত্যা করেছে।
তাই এই দাঁসায় নাচের সময় সমস্ত পুরুষেরা নারীর ছদ্মবেশে সজ্জিত হয়ে তাঁদের রাজাকে খুঁজছেন।লোকগাথা অনুসারে তাঁদের রাজা "হুদুরদুর্গা"কে বা ঘোড়াসুরকে সব সময় ঘিরে থাকত সাত জন বীর যোদ্ধা।তাইএই যোদ্ধারাই নারীর ছদ্মবেশ ধারণ করে তাদের রাজাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়েন।
হাতের অস্ত্রগুলিকে বাদ্যযন্ত্রের আকার দিয়ে ক্যামোফ্লেজ করে রাখা হয়;যাতে প্রয়োজনে যুদ্ধ বিজয়ে এগুলো কাজে লাগে।
©ArkaSamant